
জকিগঞ্জ উপজেলা তালামীযের সম্মেলনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহের সভাপতি ও সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী।
গত ৮ জুন জকিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত উপজেলা তালামীযের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্মেলনে উপস্থিত হতে প্রশাসন থেকে আমাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে কেন? এর পিছনে কারা? পরবর্তীতে তাঁর ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি অতিউৎসাহী প্রতিক্রিয়াশীল অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়নি। এসব প্রতিবেদনে জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে প্রশাসনের অতিউৎসাহী এক কর্মকর্তা সম্মেলন আয়োজনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রশাসনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে বক্তব্য দেওয়া হয়।
এদিকে এসব প্রতিক্রিয়াশীল অতিউৎসাহী অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি আল ইসলাহ সভাপতির বক্তব্যকে ‘সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তালামীয ও আল ইসলাহের নেতাকর্মীদের দাবি, ঘটনাটি বাস্তব এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা তালামীযের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর উপস্থিতি নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে সম্মেলনের আগের রাতে জকিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ সুজন মিয়া তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর (০১৬৫০২৬৮৭৯২) থেকে ফোন করেন।
জানা গেছে, কলটি সরাসরি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী গ্রহণ না করে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী রিসিভ করেন। সে সময় তালামীয ও আল ইসলাহের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফোনে সম্মেলনে উপস্থিত না হওয়ার বিষয়ে বার্তা দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আল ইসলাহ সভাপতি।
স্থানীয়দের মতে, সম্মেলনের বিষয়ে থানা প্রশাসনের অবগত থাকার পরও আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে সরাসরি প্রধান অতিথিকে ফোন করা একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার শোভন আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন জনৈক কর্মকর্তার নজরে এলে তিনি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরীকে ফোন করে বিষয়টি নিয়ে ‘কিছু মনে না নেওয়ার’ অনুরোধ জানান এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সম্মেলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় শুধু ওসি (তদন্ত) সুজন মিয়াই নন, একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন যুবনেতাও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তালামীয নেতাকর্মীরা।
তাদের দাবি, সম্মেলনের আগের রাতে ওসি (তদন্ত) কর্তৃক ফোন করার কিছুক্ষণ আগে দুইটি মোটরসাইকেলে করে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের কয়েকজন যুবনেতাকে থানায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। জুলাই-পরবর্তী সময়ে স্থানীয়ভাবে তারা থানার ঘনিষ্ঠজন বা প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তালামীয নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, সমাবেশস্থল পরিদর্শন শেষে তারা যখন ডাকবাংলো এলাকা ত্যাগ করেন, তখন গভীর রাতে ওই ব্যক্তিদের পুনরায় সেখানে আসতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট যুবনেতারা থানায় অবস্থানকালে ওসি (তদন্ত) সুজন মিয়া আল ইসলাহ সভাপতিকে ফোন করেন বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সময়ে জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক ছুটিতে ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি নিজেও মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীকে ফোন করে সম্মেলনে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না হয়ে বিকল্প কাউকে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান লেখালেখির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরীকে সম্মেলনে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্মেলন আয়োজন বা পরিচালনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “আয়োজকরা সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্মেলন সম্পন্ন করেছেন। অনুষ্ঠানের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জকিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিজেও মাঠে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন।”
তবে তালামীয ও আল ইসলাহের নেতাকর্মীদের দাবি, কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিকে উপস্থিত না হওয়ার অনুরোধ জানানো নিজেই এক ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। তাদের মতে, সম্মেলন বন্ধ করা সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও পূর্ববর্তী যোগাযোগ ও চাপ প্রয়োগের চেষ্টার কারণেই মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।