
সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জের মানুষের কাছে সিলেট শহরে পৌঁছানোর প্রধান ও সরাসরি পথ শেওলা-জকিগঞ্জ সড়ক। অথচ দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় এই সড়কটি পরিণত হয়েছিল এক মরণফাঁদে। প্রতিদিন যাতায়াত মানেই ছিল জীবনের চরম ঝুঁকি। অবশেষে দীর্ঘদিন ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর সীমাহীন যাতায়াত কষ্টের শিকার এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। অবসান ঘটেছে বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষার। জকিগঞ্জবাসীর প্রধান দুর্ভোগের নাম হিসেবে পরিচিত এই সড়কটি এবার আধুনিক ও টেকসই রূপ পেতে যাচ্ছে। প্রায় ৫৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্পের দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান সড়কটির এই যুগান্তকারী উন্নয়নকাজের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত একটি টেকসই, আধুনিক এবং নিরাপদ যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই বিশেষ ও বৃহৎ উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আখের আশার আলোর মুখ দেখছেন এই অঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সড়কটি শুধু জকিগঞ্জ নয়, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারসহ পুরো পূর্ব সিলেট অঞ্চলের মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের পথ। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই সড়কটির দীর্ঘ অংশজুড়ে খানাখন্দে বেহাল দশা তৈরি হয়েছিল। যেখানে প্রতিটি গর্ত যেন একটি নতুন দুর্ঘটনার ফাঁদ পেতে বসে থাকত। বর্ষায় গর্তে জমে থাকা পানি আর কাদার কারণে যানবাহন আটকে পড়ে তৈরি হতো তীব্র যানজট। আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির দাপটে রাস্তায় চলাচল ছিল দুর্বিষহ। শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ রোগীরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রাস্তায় চলাচল করতেন। ফলে পুরো সড়কটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
জানা গেছে, জকিগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই সড়কটির সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক পরিকল্পনা। মোট সড়কের মধ্যে সম্প্রতি সংস্কার করা ৪ কিলোমিটার অংশ বাদে বাকি ১৪ কিলোমিটার রাস্তা সমসাময়িক উচ্চ মানদণ্ড বজায় রেখে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ও শক্তিশালী কাঠামোতে তৈরি করা হবে।
শুধু পিচঢালাই রাস্তাই নয়, যাতায়াতকে আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী, জলাবদ্ধতামুক্ত ও ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ১৭টি নতুন কালভার্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত সড়ক অবকাঠামো শুধু যাতায়াতই সহজ করে না, বরং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, সীমান্ত অর্থনীতি এবং জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এই মেগা প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিক অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও গুণগত মানের প্রত্যাশা
সড়কটি আধুনিকায়নের চূড়ান্ত অনুমোদনের খবর জকিগঞ্জে পৌঁছালে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে এক আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর অবর্ণনীয় কষ্ট থেকে মুক্তির এই খবরে স্বস্তি প্রকাশ করলেও কাজের গুণগত মান বজায় রাখার ব্যাপারে শতভাগ সচেতন ও সোচ্চার এলাকাবাসী।
বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর কাছে এলাকাবাসী শতভাগ মানসম্মত ও স্বচ্ছ কাজ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার না করে একটি দৃষ্টিনন্দন ও দীর্ঘস্থায়ী সড়ক উপহার দেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল প্রত্যাশা।
একটি জনপদের উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে নিরাপদ ও চলনসই যোগাযোগ ব্যবস্থা। শেওলা-জকিগঞ্জ সড়কটি এখন শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি হাজারো মানুষের আশা, স্বপ্ন ও বাঁচার সঙ্গে জড়িত। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রকল্পটি দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠবে এবং জকিগঞ্জ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।