
ভেজাল আর কৃত্রিমতার ভিড়ে খাঁটি খাদ্যপণ্য এখন সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা। আম, মধু কিংবা গুড়ের মতো পরিচিত পণ্যের ক্ষেত্রেও ভরসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় সিলেটবাসীর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে অনলাইন উদ্যোগ ‘অর্গানিক মার্ট’। এর পেছনে রয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা রাহেল আহমদ চৌধুরী।
সিলেটের জকিগঞ্জে তাঁর গ্রামের বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে সিলেট শহরের টিলাগড় এলাকায় ‘মেসার্স সেবা এন্টারপ্রাইজ’ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতাই একসময় তাঁকে নতুন চিন্তার দিকে এগিয়ে নেয়। ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় অর্গানিক মার্ট।
এই উদ্যোগের শুরুটা ছিল একেবারেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। শহরে বসবাসের কারণে পরিবারের জন্য মৌসুমে ভালো মানের আম সংগ্রহ করা ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালে ব্যবসায়িক সূত্রে রাজশাহীর রাজু আহমেদের সঙ্গে পরিচয়ের পর রাজশাহীর বিভিন্ন বাগান থেকে কেমিক্যালমুক্ত আম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়। শুরুতে এসব আম ছিল শুধুই পরিবারের জন্য।
পরিবারের জন্য আনা সেই আমের ছবি ও অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতেই আশপাশের মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরিচিতজন থেকে শুরু করে দেশের বাইরে থাকা অনেকেই জানতে চান, কোথা থেকে পাওয়া যাচ্ছে এই খাঁটি আম। মানুষের এই আগ্রহই ২০২২ সালে তাঁকে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি প্রথমবারের মতো অনলাইনে রাজশাহীর ফ্রেশ, কেমিক্যালমুক্ত আম সরবরাহের ঘোষণা দেন। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া আসে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ এলাকার প্রবাসী পরিবারগুলো অর্ডার দিতে শুরু করে। দায়িত্ববোধ ও বিশ্বাসের জায়গা থেকেই তিনি নিজে আম সংগ্রহ করে সিলেটে এনে, পরে গাড়ি ভাড়া করে জকিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেন।
প্রথম বছরেই প্রায় চার টন আম বিক্রি করে তিনি প্রমাণ করেন, আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে গড়া ব্যবসা কখনো ছোট থাকে না। এরপর থেকে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে সরবরাহ করে আসছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার ও ক্রেতার সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এই ধারাবাহিক সাফল্য থেকেই জন্ম নেয় ‘অর্গানিক মার্ট’ নামের একটি স্থায়ী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এখানে শুধু আম নয়, ভেজালমুক্ত ও প্রাকৃতিক পণ্যের একটি নির্ভরযোগ্য সংগ্রহ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
পণ্যের পরিসর বাড়াতে তিনি সাতক্ষীরার এক উদ্যোক্তার সঙ্গে যুক্ত হন, যিনি সুন্দরবনের চাকের খাঁটি মধু সংগ্রহ করেন এবং নিজস্ব কারখানায় কাঠের ঘানি ভাঙা সরিষার তেল ও খাঁটি গাওয়া ঘি উৎপাদন করেন। রাহেল আহমদ চৌধুরী নিজে সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে, মান যাচাই করে তারপরই পণ্য বাজারে আনেন। পণ্যের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাসের কারণে ভেজাল প্রমাণিত হলে পণ্য ফেরতের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। এসব পণ্য বিএসটিআই অনুমোদিত।
বর্তমানে ‘অর্গানিক মার্ট’-এর মাধ্যমে খাঁটি মধু, গাওয়া ঘি, কাঠের ঘানি ভাঙা সরিষার তেল, বারোমাসি আম, মৌসুমি খেজুরের রস ও খেজুরের গুড় সরবরাহ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাহেল আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খাঁটি ও প্রাকৃতিক পণ্য এক প্ল্যাটফর্মে এনে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চান তিনি। বিশেষ করে সিলেটবাসীর জন্য নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করাই তাঁর অগ্রাধিকার।
একটি ব্যক্তিগত প্রয়োজন থেকে শুরু হয়ে আজ যে উদ্যোগ মানুষের আস্থার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে, অর্গানিক মার্ট তার বাস্তব উদাহরণ। সততা, দায়বদ্ধতা ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে তরুণদের হাত ধরেই যে পরিবর্তন আসে, রাহেল আহমদ চৌধুরীর এই পথচলা সেটিই প্রমাণ করে।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।