হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মোড়াকরি গ্রামে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রাসবিহারী সাহার বাড়ি। একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যে সাফল্য অর্জন করে এ পরিবারের পূর্বপুরুষেরা প্রায় ২৪০ বিঘা জমির মালিক হয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন চুন, খয়ের ও সুরকি দিয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন আজ ধ্বংসের মুখে। অযত্ন-অবহেলা আর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের আসামের শিলচর থেকে পায়ে হেঁটে মোড়াকরি গ্রামে এসেছিলেন রাসবিহারী সাহার পূর্বপুরুষেরা। এ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে তাঁরা পাট, কাঠ ও সুপারির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় সাফল্য আসার পর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ২৪০ বিঘা জমি কেনেন তাঁরা। একপর্যায়ে পুরোনো নির্মাণশৈলীতে চুন, খয়ের ও সুরকি দিয়ে তৈরি করেন নান্দনিক একটি বাড়ি। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী আজও তাঁদের অতীত আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করেন সেখানকার পুরোহিত প্রয়াত গোপেশ চক্রবর্তীর ছেলে রামপ্রসাদ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘বাবার জীবদ্দশায় তাঁর কাছ থেকে এসব ইতিহাস শুনেছি। তাঁদের পরিবার আসামের শিলচর থেকে ব্রিটিশ আমলে মোড়াকরি গ্রামে এসেছিল। তাঁদের পাঁচ ভাই ছিলেন। হরেন্দ্র রায়, ব্রজেন্দ্র রায়, দেবেন্দ্র রায়, নরেন্দ্র রায় এবং সবার ছোট রাসবিহারী সাহা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতার পাশাপাশি তাঁরা এ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হন।’
রামপ্রসাদ চক্রবর্তী জানান, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর তাঁদের তিন ভাই কলকাতায় চলে যান। পরে পাকিস্তান আমলে রাসবিহারী সাহা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে জেনেছেন। পাকিস্তান আমলের পর অন্য ভাইয়েরাও কলকাতায় চলে যান। তবে রাসবিহারী সাহা নিজ বাড়িতেই থেকে যান।
রাসবিহারী সাহার মৃত্যুর স্মৃতিও এখনো মনে রেখেছেন রামপ্রসাদ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘১৯৭৬ সালের দিকে নিজ বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন রাসবিহারী সাহা। তখন আমার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। অন্যদের সঙ্গে আমিও শ্মশানে গিয়ে তাঁর মরদেহের সৎকারে অংশ নিয়েছিলাম।’
রামপ্রসাদ চক্রবর্তী আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে রাসবিহারী সাহার সন্তানেরা তাঁদের মাকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর ১৯৮৪-৮৫ সালের পর থেকে বাড়িটি কে বা কারা লিজ নিয়ে ভোগদখল করছেন, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
স্থানীয়দের ধারণা, একসময় রাসবিহারী সাহার পরিবারকে ঘিরে এ এলাকায় গড়ে উঠেছিল বিশেষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ। বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও নানা স্মৃতিময় ইতিহাস। পুরোনো দেয়াল, স্থাপত্যশৈলী ও বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আজও অতীত দিনের সাক্ষ্য বহন করছে।
তবে পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ, বসবাসের পরিবর্তন এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ এখন জরাজীর্ণ। একসময় যে বাড়ি ছিল এলাকার মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু, সেটিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্মৃতি থেকে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তা অমূল্য সম্পদ। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে রাসবিহারী সাহার বাড়িটি সংরক্ষণের পাশাপাশি লাখাই উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
এলাকাবাসীর দাবি, বাড়িটির প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ এবং স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক রাসবিহারী সাহার বাড়িটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যথায় লাখাইয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায় একসময় হয়তো শুধু প্রবীণদের স্মৃতির পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।


