মূল কনটেন্টে যান
বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনে হুমকিতে জাফলংয়ের ৭০০ বছরের ঐতিহ্য, ধসের ঝুঁকিতে কালীমন্দির


অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনে হুমকিতে জাফলংয়ের ৭০০ বছরের ঐতিহ্য, ধসের ঝুঁকিতে কালীমন্দির

সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র জাফলং। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এই এলাকা। তবে অবাধে বালু-পাথর উত্তোলন ও নদীভাঙনের কারণে জাফলংয়ের প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দির এবং খাসিয়া রাজাদের স্মৃতিবিজড়িত জুমপাড় এখন অস্তিত্ব সংকটে। চারপাশে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় মন্দিরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন একটি টিলায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রাচীন এই স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ী মন্দির নামে পরিচিত এই উপাসনালয়টি জাফলংয়ের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর অন্যতম। একসময় মন্দিরে যাতায়াতের স্বাভাবিক পথ থাকলেও বর্তমানে চারপাশে বালু-পাথর উত্তোলন এবং পিয়াইন নদীর ভাঙনে সেই পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। মন্দিরের চারপাশে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় টিলাটি এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় মন্দিরটি ধসে পড়তে পারে। এতে হারিয়ে যেতে পারে ধর্মীয় অনুভূতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা।

মন্দিরের অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩ নম্বর পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের ছৈলাখেল ৩য় খণ্ডের বল্লাপুঞ্জী সংলগ্ন এলাকায় ১ নম্বর খতিয়ানের ২৭ নম্বর দাগে ১৬ শতক জায়গার ওপর ঐতিহাসিক মন্দিরটি অবস্থিত। পাথর টিল্লা মামার বাজার এলাকার নন্দমহনের ছেলে কুঞ্জবিহারী সেবাইতের মাধ্যমে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ব্যবহারের জন্য জায়গাটি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র এই উপাসনালয়টি জাফলংয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছেও পরিচিত একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে।

ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এ অঞ্চলে খাসিয়া ‘মালনিয়াং’ রাজবংশের শাসন ছিল। মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন পান-সুপারি বাগানঘেরা জুমপাড় এলাকায় নিয়াং ও মাইলং রাজাদের আমলের রাজপ্রাসাদ ও উপাসনালয়ের প্রাচীন পাথরের দেয়াল, ফটক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়েছে।

স্থানটি স্থানীয়ভাবে ‘জাফলং রাজবাড়ী’ বা ‘খাসিয়া রাজবাড়ী’ নামে পরিচিত। তবে সংশ্লিষ্টদের বর্ণনা অনুযায়ী, এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দির অন্যতম। এর চারপাশে বিশাল পাথরের প্রাচীর ও ফটক থাকায় অনেকেই একে রাজবাড়ি বলে মনে করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো সভ্যতা ও ঐতিহ্যের স্মারক।

চারপাশে গভীর গর্ত, বিচ্ছিন্ন মন্দির

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে বল্লাঘাট এলাকার জুমপাহাড়ের পাদদেশে রাতের আঁধারে এক শ্রেণির অসাধু চক্র অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছে। এতে পুরো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মন্দিরের পাদদেশ ঘেঁষে চারপাশের মাটি ও পাথর তুলে নেওয়ায় টিলাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মন্দিরে ওঠার বা যাওয়ার স্বাভাবিক কোনো পথ নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি টিলার ওপর কোনোমতে টিকে আছে স্থাপনাটি।

শুধু মন্দির নয়, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে আশপাশের বাগান, ফসলি জমি ও প্রাচীন স্থাপনাগুলোও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই পবিত্র স্থানের এমন দুরবস্থায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

‘স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেয়াল না দিলে মন্দির রক্ষা করা যাবে না’

মামার বাজার পাথর টিল্লা কালী মন্দির পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি শ্রী অংশু গোসাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাতের আঁধারে যন্ত্রদানব দিয়ে যেভাবে পাথর ও মাটি সরানো হয়েছে, তাতে আমাদের এই পবিত্র স্থানটির পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও পাথরখেকো চক্র সুযোগ পেলেই আবার খনন শুরু করে।’

তিনি বলেন, দ্রুত স্থায়ী বাঁধ বা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ না করলে আগামী বর্ষায় মন্দিরটি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রত্নসম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের দাবি

ঐতিহাসিক স্থান ও এর চারপাশের ফসলি জমি রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কাজ করছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম দৈনিক এদিনকে বলেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা। এ দুই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরের জুম নামে পরিচিত স্থাপনাটি ধ্বংসের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে এখানে সর্বনাশ করা হয়েছে।’

আব্দুল করিম কিমের অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন স্থাপনাটি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখেনি।

তিনি অবিলম্বে পাথর উত্তোলন বন্ধ, স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্য ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী দৈনিক এদিনকে বলেন, জাফলংয়ের জুমপাড় এলাকায় অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক মন্দিরটি রক্ষায় আমরা অত্যন্ত আন্তরিক। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।’

ইউএনও আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও আশপাশের ফসলি জমি রক্ষায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্দিরটি সুরক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতীক জাফলংয়ের প্রাচীন কালীমন্দির ও জুমপাড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো রক্ষায় আর কালক্ষেপণ করতে চান না স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি মন্দিরটির ঝুঁকিপূর্ণ অংশে দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ঐতিহ্য ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রাচীন এই সম্পদ সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।