মূল কনটেন্টে যান
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

জিন্নাহ ছাড়া পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও না : মাওলানা মারজান


নিজস্ব প্রতিবেদক
জিন্নাহ ছাড়া পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও না : মাওলানা মারজান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ও ঐতিহাসিক নথিপত্র প্রদর্শন নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝে বিষয়টি নিয়ে একটি সুদীর্ঘ ও গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জার্মানির এরফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরী।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি জিন্নাহর রাজনৈতিক অবদান, ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বর্তমান সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাঠকের উদ্দেশ্যে তাঁর পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

জিন্নাহকে কতটুকু ঘেন্না করা উচিত? 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র রাজনেতা, যিনি প্রায় একা একটি রাষ্ট্রের ভিত গড়ে দিয়েছেন। এতবড় সাফল্য থাকলে গালি তো খেতেই হবে; জিন্নাহও খাচ্ছেন।

জিন্নাহ’র প্রতি ভারতীয়দের বিতৃষ্ণা থাকাটা বেশ যৌক্তিক। ভারতমাতার বাটোয়ারাকারীকে তারা কীভাবে মেনে নেবে! তবে জিন্নাহ’র বিরুদ্ধে বাংলাদেশী মুসলমানদের অভিযোগ কী? জিন্নাহ সাম্প্রদায়িক ছিলেন? ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করেছেন? নাকি আমাদের অধিকার খেয়ে বসেছেন?

প্রথমত, ধর্মের ভিত্তিতে নয়; পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে। যেদিন ভারতের প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন; যেদিন নবাবগণ মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে দরকষাকষির সূচনা করছেন; মূলত সেদিন থেকেই একটি আশা দানা বেঁধেছে। ১৯৩০ সালে সেই আশার চিন্তাগত ভিত্তি দিয়েছেন আল্লামা ইকবাল। এলাহাবাদে মুসলিম লীগের ২১তম বার্ষিক সভায় ইকবাল বলেছিলেন, মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। তাই ভারতের উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, এটিই নিয়তি। যদি তা হয়, তাইলে ইসলামের স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

কেন দরকার পড়েছিল একটি আলাদা রাষ্ট্রের? এক কথায়, হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক আচরণ ও ভবিষ্যত আশঙ্কার কথা ভেবে। আজ ভারতের মুসলমানদের অবস্থাটা দেখুন। সিলেটের বুরহানউদ্দীনের সাথে গৌড়গোবিন্দ যে আচরণ করেছিল, কয়েক শতাব্দী পরে এসেও তা ছিল এ অঞ্চলের নিত্যাকার চিত্র। বাংলার মুসলমান হিন্দু জমিদারদের হাতে নিষ্পেষিত ছিল। তাই তাঁরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিল, ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিল। বনেদি মুসলিম পরিবারগুলো পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল ছিল। হ্যাঁ, ‘৪৭-এর স্বাধীনতা এসেছিল লাখো দেশহারা মানুষ ও সাগরসম রক্ত পেরিয়ে। তবে এজন্য দায়ী ব্রিটিশ সরকার। নতুন দুটি রাষ্ট্রকে চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে রেখে ব্রিটিশরা চলে গিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহও ইন্তেকাল করেছেন।

দ্বিতীয়ত, জিন্নাহ’র রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িকতা বলে গালি দেওয়া বাঙালি বঙ্কিমচন্দ্রের মতো মুসলিম-বিদ্বেষী ইতরকে সাম্প্রদায়িক মনে করে না! ইনিয়ে-বিনিয়ে মুসলমানদেরকে নিচু করা বহু কবি-সাহিত্যিক বাঙালির কাছে চরম পূজ্য। অথচ বঙ্গভঙ্গের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকরা কি পরিমাণ সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়েছে, সেটি কারও অজানা নয়। জিন্নাহ’র বহু আগে থেকেই RSS এর বিনায়ক সাভারকর ভারতে হিন্দু-মুসলিম আলাদা করার দাবি করছিল। সবার কথা বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার দায় শুধু একজনের ওপর কেন আসে? মুসলিম বলে?

তৃতীয়ত, একটি পপুলার কথা চলমান যে, জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। অথচ তখন মাতৃভাষার প্রশ্ন ছিল না। তিনি চেয়েছেন, যেহেতু উর্দু সর্বভারতীয় মুসলমানদের inter-regional lingua franca ছিল, সুতরাং উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। ব্যস এতটুকুই। জিন্নাহ’র নিজেরও মাতৃভাষা উর্দু ছিল না; ছিল গুজরাটি। তিনি উর্দুতে স্বাচ্ছন্দ্যে কথাই বলতে পারতেন না।

তো মোদ্দাকথা হলো, জিন্নাহকে কতটুকু ঘেন্না করা উচিত? আপনি যদি ক্লাস ফাইভের ইতিহাসের কেতাব ব্যতীত আর কিছুই না পড়েন এবং মনে করেন, ‘৭১ সালে জিন্নাহ শামস বাহিনীর সদস্য হিসেবে হাফপ্যান্ট পরে মানুষকে লাঠিপেটা করেছে, তাইলে তো জিন্নাহকে ঘেন্না করা আপনার কর্তব্য। আপনি যদি উনবিংশ-বিংশ শতকের হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’র পেট থেকে বের হওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদে আকৃষ্ট হন, তাইলে জিন্নাহকে গালি দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব। তবে আপনি যদি মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও স্বাধীকারে বিশ্বাসী হন, জিন্নাহকে নিয়ে আপনার দ্বিতীয়বার ভাবার অবকাশ আছে।

জিন্নাহ ‘আদর্শ ইসলামী’ ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তাঁর রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা করার অবকাশ আছে। তবে জিন্নাহ ছাড়া পাকিস্তান হতো না এবং পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও না। আজ আমরা ভারতের কোনো এক চিপাগলিতে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বন্দেমাতরম গাইতাম! একজন তুখোড় আইনজীবী ও রাজনেতার আন্তরিক প্রচেষ্টায় ভারতের বহু মুসলমানকে সেই দিন দেখতে হয়নি।

আল্লাহ তাঁর জীবনের গোনাহগুলো মাফ করে দিন।।