
তুচ্ছ ঘটনার জেরে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি জামিনে মুক্তি পেয়ে গ্রামের শতবর্ষী পঞ্চায়েতি কবরস্থানে আস্তানা গড়ে তুলেছেন। মাথায় সাদা পাগড়ি আর হাতে লোহার রড নিয়ে চলাফেরা করা ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তির নাম গয়াছ মিয়া, যিনি নিজেকে ‘স্বপ্নে আদিষ্ট পীর’ বলে দাবি করছেন। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামে গত প্রায় এক বছর ধরে কবরস্থানের জঙ্গলে একটি বড় গাছের নিচে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি দোতলা ঘরে তার এই বসবাস চলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আধ্যাত্মিক সাধনার নামে সেখানে আসলে মাদক, জুয়া ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আসর বসানো হচ্ছে, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল সামান্য বিরোধের জেরে দুই যুবককে ছুরিকাঘাত করেছিলেন বাজিতপুর গ্রামের বাসিন্দা গয়াছ মিয়া। ওই ঘটনায় জাকির হোসেন নামের এক যুবক প্রাণ হারান এবং জিহান মিয়া নামের অন্য একজন গুরুতর জখম হন। ঘটনার পর পুলিশ গয়াছকে গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন জেল খাটার পর তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন। এরপর থেকেই নির্জন কবরস্থানের জায়গা দখল করে তিনি এই কার্যক্রম শুরু করেন। তার এমন কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ভীতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ১৭ জুন এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে গয়াছের আস্তানা উচ্ছেদ, কবরস্থান রক্ষা এবং মসজিদের সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি জানানো হয়।
এলাকার আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাজিতপুর গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা কামাল উদ্দিন জানান, গয়াছ মিয়া কবরস্থানে আস্তানা বানিয়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসমূহ নিয়ে ঘোরাফেরা করেন, যার কারণে এলাকার চারটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবসময় আতঙ্কে থাকে। সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ান্দের ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, জামিন পাওয়ার পর থেকেই হত্যা মামলার এই আসামি কবরস্থানের জঙ্গলে থাকছেন এবং তার হাতে প্রায়ই দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড দেখা যায়। বাজিতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহীন আলম অভিযোগ করেন, সন্ধ্যার পর থেকে ওই আস্তানায় মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আনাগোনা বাড়ে, যা স্থানীয়দের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এছাড়া বাজিতপুর জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লি সুনুর মিয়া বলেন, একটি পবিত্র কবরস্থানে এ ধরনের অনৈতিক ও অসামাজিক কাজ ধর্মীয় কিংবা সামাজিকভাবে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন গয়াছ মিয়া। তার দাবি, স্বপ্নে এক অলি-আউলিয়ার নির্দেশনা পেয়েই তিনি এই পবিত্র স্থানে অবস্থান করছেন এবং কোনো ধরণের মাদক বা জুয়ার আসরের সাথে তার সম্পৃক্ততা নেই। বরং তিনি সেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা করছেন এবং মানুষের কল্যাণ করার চেষ্টা করছেন। নিজের এই আশ্রয়ের পেছনে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, কিছু মানুষ তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে এবং বসতভিটা বিক্রি করে দেওয়ায় নিরুপায় হয়ে তিনি কবরস্থানের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে গয়াছ মিয়ার এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তার ছুরিকাঘাতে নিহত জাকির হোসেনের বাবা রুহুল আমিন। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তুচ্ছ কারণে গয়াছ তার ছেলেকে হত্যা করলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় কীভাবে জামিন পেল, তা তার বোধগম্য নয়। এখন এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় গয়াছ তাকে নানাভাবে হুমকি দেয় ও গালিগালাজ করে। নিজের এক ছেলেকে হারিয়ে এখন তিনি এতটাই ভীত যে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছেন না, এমনকি গ্রিস থেকে সম্প্রতি বাড়িতে আসা তার ছোট ছেলেকেও গয়াছ হুমকি দিয়েছে বলে জানান। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া বা জমি দখলের দাবির বিষয়ে রুহুল আমিন জানান, গয়াছের ঘরবাড়িতে কেউ আগুন দেয়নি এবং তার জায়গা-জমিও কেউ জোরপূর্বক বিক্রি করেনি।
সামগ্রিক বিষয়ে দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, গয়াছ মিয়ার বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন বিষয়ে কিছু মানুষ অভিযোগ করেছেন। আবার অনেকে বলছেন স্থানটি বন বিভাগের আওতাধীন। ভূমির মালিকানার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন খতিয়ে দেখবে এবং মাদকের অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। হত্যা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, এটি অনেক আগের ঘটনা হওয়ায় বিস্তারিত খোঁজ না নিয়ে এই মুহূর্তে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহ জানান, থানার ওসি এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলেছেন এবং প্রাপ্ত লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।