বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সিলেট–ছাতক বাজার রেলপথ পুনর্বাসনের কাজ তিন বছরে এগোতে পেরেছে মাত্র ২৩ শতাংশ। ২৪১ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি মেয়াদ চলে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের অগ্রগতি এখনো থমকে রয়েছে। কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের অগ্রগতি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রাথমিক নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ আরও প্রায় তিন বছর সময় বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছে ৪৪ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এটি অনুমোদিত মোট বাজেটের ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২৪১ কোটি ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ১৮৪ কোটি ৮৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে ৫৬ কোটি ৭৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
আমরা কারো লেজুর ছিলামও না, কারো লেজুরভিত্তিক সংগঠন নয়: মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী২৫ অক্টোবর ২০২৬বাংলাদেশ রেলওয়ের চালুকৃত প্রকল্প পরিকল্পনায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাস্তব অগ্রগতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাসে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ, যার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে কাজ হয়েছে ১ শতাংশ।
উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালে চালু হওয়া সিলেট–ছাতক বাজার মিটারগেজ রেলপথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। একসময় সিলেট ও সুনামগঞ্জের মানুষের যাতায়াত এবং ছাতক এলাকার চুনাপাথরসহ বিভিন্ন শিল্প পণ্য পরিবহনে এই রুটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সূচনাকালে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই লাইনে আর ট্রেন ফেরেনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ছাতক অংশের প্রায় ১৩ কিলোমিটার রেললাইন এবং বাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বন্যার পানির স্রোতে মাটির বাঁধ, পাথর ও স্লিপার সরে গিয়ে সিলেটের সঙ্গে ছাতকের সরাসরি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর থেকে এই অঞ্চলের সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা বিকল্প সড়কপথে অতিরিক্ত খরচে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ফেলে রাখার কারণে লাইনটির অনেক মূল্যবান পাত ও যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুসারে, ক্ষতিগ্রস্ত লাইন অপসারণ, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামতের পাশাপাশি নতুন স্লিপার ও রেললাইন বসানোর কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত পুরো ৩৪ কিলোমিটার এলাকার পুরোনো রেললাইন তুলে ফেলা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটির অনুমোদন ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিতে পাস হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডকে (এমএএইচএল) দায়িত্ব দেওয়া হলে একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কাজের ধীরগতির পেছনে মূল কারণ ছিল প্রাকৃতিক ও আমদানি জটিলতা। দেড় বছর মেয়াদি কাজের মাঝে দুটি বর্ষা মৌসুম পাড়ি দিতে গিয়ে মাটির কাজ থমকে যায়। পাশাপাশি সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় কিছু মালামাল আনার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
বন্যার ক্ষতি সামলে এই পথে জলপ্রবাহ নিশ্চিতের জন্য পর্যাপ্ত কালভার্ট নির্মাণ ও বাঁধ উঁচু করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের মন্থরগতির কারণে আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে সংশয় রয়ে গেছে।


