মুরাদ মিয়া
২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাবার স্মৃতিগুলো বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস বাবার অভাব আজও অনুভব করি

ছবি : লেখকের পিতা মো: শাহনুর মিয়া

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার আমার শ্রদ্ধাভাজন বাবা তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ৩ বারের সাবেক ইউপি সদস্য মো. শাহনুর মিয়া নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। আব্বার ত্যাগ-স্মৃতি হরদম মনের গ্যালারিতে ভাসলেও মৃত্যুর তারিখটি যেন কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই বাবা আমাদের ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

আগামীকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি বাবা চলে যাবার ১ বছর পূর্ণ হবে। এই ১ বছরে প্রতিনিয়তই বাবার অপরিসীম শূন্যতা অনুভব করছি। বাবার ছায়া কত যে বিশাল সেটি বোধহয় কেবল যারা বাবা হারায় তারাই বুঝে। বুকভরা বিষণ্ণতা আজও আমাদের অশ্রুসিক্ত করছে।

বাবা দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের শব্দ। স্নেহের শীতল ছায়াতলের বটবৃক্ষের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো শব্দ। বাবাকে আমাদের ভাই-বোনেরা আব্বা ডাকতাম, আমার কাছে মনে হতো এই সম্বোধনটাই বেশি কোমল এবং বেশি কাছের। প্রতিটি সন্তানের বুকজুড়ে থাকে বাবার প্রতি চির অম্লান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এই ভালোবাসা জগতের সকল কিছুর তুলনার ঊর্ধ্বে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে যখন কোনো বিপদে দিশাহারা হয়ে পড়ি, অভিভাবকহীনতার কষ্টে ভুগি, কারো পরামর্শ চাইলে শুনতে হয়, “দেখো তুমি এখন বড় বা দায়িত্বশীল পর্যায়ে আছো, যা ভালো মনে করো তাই করো।” বাবা থাকতে মনে হতো না আমি বড় হয়েছি, মনে হতো এখনো ছোট আছি। এখন মনে হয় বয়স হয়েছে, নিজেরই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাবা হারানোর ব্যথা বা বাবাহীন জীবনের কষ্ট ভয়ানক। যে বাবা হারায়নি সে এই ব্যথা বুঝবে না।

একটা সময় বছরের পর বছর বাবার স্নেহ-মমতা আর কড়া শাসনের জালে বন্দি ছিলাম। আদর করলে খুশি হতাম, আর শাসন করলে মন খারাপ করতাম। আজ বুঝি, সেই শাসনটিও ছিল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। অথচ আজ বাবার স্নেহ-ভালোবাসা আর শাসন করার মতো সেই মানুষটি আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। বাবাকে কয়েক বছর ধরে হৃদয়ের গভীরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুঁজতে খুঁজতে হয়তো আমারই সময় শেষ হয়ে আসবে, তবু বাবার হাতের স্পর্শ পাব না। কোনো মায়া মমতাতেই তো আমার বাবাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। প্রতি মুহূর্তে মনের গভীরে বাবাকে অনুভব করি। মনে হয় যেন বাবা আমাদের পাশেই আছেন ছায়া হয়ে। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে মনে হয়, আমাদের বাবা এক বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন আমাদের। কিন্তু আজও বাবার স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। বাকি জীবনের জন্য খুঁজে পাচ্ছি আত্মবিশ্বাস।

বাবাকে নিয়ে যত কথা, যত স্মৃতি যা হয়তো লিখে শেষ করা যাবে না। আবার কিছু স্মৃতি সারাজীবনের জন্য শক্তি জোগাবে। আমার দেখা সাধারণে অসাধারণ মানুষদের একজন আমার আদর্শবান বাবা। সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপন করা সৎ ও কর্মনিষ্ঠ এই মানুষটি আমার জীবনের আদর্শ ছিলেন। আমার বাবা আমার কাছে বিশেষ এক আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, গর্ব। সেই গৌরব হারানোর বেদনা পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েই প্রশমিত হবার নয়। এ এক অবর্ণনীয় শূন্যতা, যা কেবল মিশে আছে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে। বাবা স্বশরীরে বেঁচে নেই, তবু বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে প্রতি মুহূর্তে। আমাদের ভালোর জন্য বাবা জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করেছেন। কখনো নিজেকে ভালো রাখার চিন্তা করেননি।

আমার বাবা ছিলেন নিভৃতচারী সত্যবাদী একজন মানুষ সবসময় সাদাকে সাদা কালো কে কালো বলতেন। ১৯৬৫ সালের ২ জুলাই আব্বা জন্মগ্রহণ করেন, এবং নীতি আদর্শে ছিলেন অটল। আদর্শবান বাবা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালনে একটুও শিথিলতা প্রদর্শন করেননি। আমাদের পরিবারের ৫ বোন ও ৬ ভাই সবাইকে আদর্শিক শাসন পালনে সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মানুষ হিসেবে যেসব মৌলিক গুণ থাকা উচিত, তাঁর সব কিছুই আব্বার কাছ থেকে শিখেছি। তিনি মানুষের বিপদে-আপদে আন্তরিকভাবে পাশে থাকতেন। সারাজীবন সৎভাবে জীবনযাপন করেছেন, মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছেন, তার দ্বারা কখনো কারো কোনো ক্ষতি সাধিত হয়নি।

তিনি আমাদের পরিবারের ভাই, বোন সবাইকে সবসময় বলতেন, “কারো উপকার করতে না পারো, কখনোই কারো ক্ষতি করো না।” ছোটোবেলা থেকেই এটা সবসময়ই বাবার মুখে শুনে এসেছি। আত্মীয়স্বজনসহ বাড়িতে কেউ এলে কখনোই তাঁকে আপ্যায়ন মেহমানদারি ছাড়া বাবা বিদায় দিতেন না।

মেহমানদারি করাতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। বলতেন, “রিজিকের মালিক আল্লাহ। রিজিকে যা আছে তা দিয়েই মেহমানদারি করো।” তাঁর এ আদর্শই তার সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। এদিকে তার সকল মানবিক গুণাবলী, কর্তব্য-পরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যথার্থই হয়ে উঠেছিল তার পরিচয়।

আমার আদর্শবান বাবা নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিলে তিলে আমাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কোনো কৃপণতা করেননি। আব্বার প্রতি আমার যে অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করেছি তা প্রকাশের ভাষা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি। আমার জীবনে যদি বলি প্রাপ্তি তবে তা হলো বাবা আমাদের মাঝে আদর্শ ও সততার বীজ বুনে দিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন সততার চেয়ে নেই কিছু মহান এই পৃথিবীতে। বাবাই আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে হকের ওপর অটল থেকে মাথা উঁচু করে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। পরিবারের প্রতিটি বিপদে বাবাকে নতুন করে চেনার পরম সৌভাগ্য হতো আমাদের।

হালাল সবসময় বরকতময় এ কথাটি সবসময় মনে করে দিতে আব্বা। বাবা আমাদের জন্য তাঁর নীতি-আদর্শ রেখে গেছেন। আদর্শ মানে গালভরা কিছু নয়। সামান্য নিয়ে ও সততার শক্তিতে কিভাবে সবকিছু কানায় কানায় ভরিয়ে রাখা যায় এ শিক্ষা দিয়েছেন। বাবা প্রায়ই বলতেন ছোট্ট একটা জীবন আনন্দময় করার জন্য সততার চেয়ে বড় আদর্শ আর কী হতে পারে। মনে অনাবিল আনন্দ আর গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকি এমন সত্যবাদী পিতার সন্তান হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি।

আব্বার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে থাকতেন। অন্যায়কে কোনদিন প্রশ্রয় দেননি। ন্যায় ও হকের পক্ষে অবিচল থাকতেন।

আব্বার মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি মানুষের যে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি দেখেছি, তা অতুলনীয় ও হৃদয়স্পর্শী। ভালোবাসার সম্ভবত একটি তরঙ্গ আছে। আব্বা যেমন মানুষকে ভালোবাসতেন, তারাও তেমনি ভালোবাসতেন আব্বাকে। ভালোবাসার সেই অদৃশ্য তরঙ্গ সবাইকে স্পর্শ করত। আব্বার মৃত্যু পরবর্তী মানুষদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, পেয়ে যাচ্ছি সেটা ভুলার মতো নয়। এগুলো আদতে অর্জন।

আব্বা নেই আজ ১ বছর পূর্ণ হয়েছে, অথচ সেই একই পরিচিতি, একই ভালোবাসা আমরা পেয়ে যাচ্ছি। এগুলো দেখে মনে হয় আব্বা দৈহিকভাবে হয়ত নেই কিন্তু তাঁর পরিচিতি এখনও রয়ে গেছে। এগুলো দেখে একদিকে গর্ব হয়, আবার অন্যদিকে নিজেকে পিতৃহীন ভেবে বুকটা হাহাকার করে ওঠে! এই হাহাকারের যন্ত্রণা যে কতটা ভারী সেটা ঠিক টের পাই! আমি নিশ্চিত জগতের অধিকাংশ পিতৃহীনেরাই টের পায়। বাবাহীন সন্তানের জীবন যে কতটা বিয়োগান্ত হয়, তা হয়তো যাদের বাবা বেঁচে আছেন তারা কখনোই বুঝতে পারবে না। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় সত্যি আমি বড়ই একা। বাবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো এটা কখনো কল্পনা করিনি। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। বাবার জীবদ্দশায় এতটা টের পাইনি। তাঁর মৃত্যুর পর যত দিন যাচ্ছে তত বেশি করে অনুভব করছি। বুঝতে পারছি মাথার ওপর ছায়া দেওয়ার মত আকাশটা আর নেই। একটা দুঃসহকাল অতিবাহিত করছি, নীড়ে থেকেও আশ্রয়হীন।

বাবার ভালোবাসা ও নির্দেশনায় সন্তানরা সারাজীবন আলোর পথ খুঁজে পায়। বাবাহীন জীবন বালুকাময়। সেখানে স্বস্তি নেই, শীতলতা নেই।

হে আরশে আজিমের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, আপনার কাছে প্রার্থনা পবিত্র মাহে রমজানের উছিলায় আব্বাকে মাফ করে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। হে আমাদের রব! তাদের প্রতি দয়া করো যেভাবে শৈশবে তারা আমাদের প্রতিপালন করেছিলেন। রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

​সান মারিনোকে হারিয়ে ইউরোপের মাটিতে প্রথম ঐতিহাসিক জয় পেল বাংলাদেশ

ইতিহাস বলছে ২০২৬ বিশ্বকাপ জিতবে না আর্জেন্টিনা! কিন্তু কেন?

গোয়াইনঘাটে কোটি টাকার সড়ক সংস্কারে নয়ছয়,কাজ শেষ না হতেই উঠছে কার্পেটিং

FIFA World Cup 2026 Schedule Revealed

মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন মৌলভীবাজারের জুনেল আহমেদ

সিলেটে অনৈতিক কাজের অভিযোগে আবাসিক হোটেল থেকে আটক ৯

‘জনগণই আমার অভিভাবক’: তাহিরপুরে ঈদ পুনর্মিলনী সভায় এমপি কামরুল

বন্ধুদের সঙ্গে জাফলংয়ে ঘুরতে এসে পানিতে ডুবে প্রাণ গেল কিশোরের

সিলেটে হামের লক্ষণ নিয়ে আইসিইউতে নার্সের মৃত্যু

‎সিলেটে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালুর ঘোষণা বাণিজ্যমন্ত্রীর

১০

টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে এসে নদীতে পড়ে কিশোর নিখোঁজ

১১

তাহিরপুরে বরযাত্রীর নৌকাডুবে ১ শিশুর মৃত্যু

১২

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা, ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলবেন লিওনেল মেসি

১৩

বাবা-মা ছাড়া ঈদ, চারিদিকে অপার শূন্যতা আর হাহাকার!

১৪

তাহিরপুরে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন এমপি কামরুল

১৫

সিলেটসহ সারা দেশে ত্যাগের মহিমায় উদ্‌যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা

১৬

ঈদের দিনে সিলেটের আবহাওয়া কেমন থাকবে, জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

১৭

বিক্রি হওয়া ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

কসকনকপুরবাসীকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানালেন লোকমান উদ্দিন নেজাম

১৯

মৌলভীবাজারে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদ্‌যাপন, অংশ নিলেন অর্ধশতাধিক মুসল্লি

২০
সবুজ প্রান্ত পরিবার গোপনীয় নীতিমালা শর্তবলী বিজ্ঞাপন আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ

সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।

ই-মেইল: [email protected] ফোন: ০১৭১১২২৪৫৯৮, ০১৭১৫-৮০৮৮০৪
স্বত্ব © সবুজ প্রান্ত মিডিয়া লিমিটেড ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।