
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। ঠিক এই সংবেদনশীল সময়ে, আগামী ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহ.)-এর ঈসালে সাওয়াব মাহফিল। প্রতিবছর লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠা এই মাহফিল এবার শুধু ইবাদত ও স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এটি পরিণত হচ্ছে সিলেটের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়বদলের কেন্দ্রবিন্দুতে।
শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর স্মৃতিকে ঘিরে আয়োজিত এই মাহফিল ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ফলে ফুলতলীর ময়দান মানেই শুধু দোয়া ও দরুদ নয়, বরং এখান থেকেই অনেক সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনের আগে এই মাহফিল সিলেটের ভোটের অঙ্ক নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে।
মাহফিলকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের আনাগোনা চোখে পড়ছে। নিয়মিত মাজার জিয়ারত, ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে উপস্থিতি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আশীর্বাদ প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য একটাই – ফুলতলী মসলকের মুরীদিন ও মুহিব্বিনদের আস্থা অর্জন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এই তৎপরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের প্রার্থীদের অনেকেই মনে করছেন, ফুলতলীর সমর্থন ছাড়া এই অঞ্চলে নির্বাচনী লড়াই পূর্ণতা পায় না। তাই মাহফিলের আগে-পরে ফুলতলী ছাহেব বাড়ি হয়ে উঠছে এক নীরব রাজনৈতিক মিলনকেন্দ্র।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও শিক্ষাব্যবস্থা ও মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন ছাহেব কিবলাহ ফুলতলীর ছোট ছাহেবজাদা, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহর সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী কিছু বিতর্কিত পাঠ বাতিল হওয়াকে ফুলতলী মসলকের বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়।
তবে চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নবম-দশম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে সমকামিতা নির্দেশক কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচনে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ফুলতলী দরবারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রত্যাশা হয়ে উঠবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এবার মৌলভীবাজার জেলার দুটি আসনে আল ইসলাহ নিজস্ব প্রার্থী দিয়েছে। বাকি ১৭টি আসনে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে ধারণা, যেসব প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহারে ফুলতলী মসলকের চিন্তাধারা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকবে, তারাই এই গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেতে পারেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ফুলতলী মসলকের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কেমন হতে পারে, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। তবে যেসব আসনে আল ইসলাহ প্রার্থী দেয়নি, সেখানে যে দল বা ব্যক্তি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর অসম্পূর্ণ কাজ বাস্তবায়নের ওয়াদা করবেন। তারাই ফুলতলীর সমর্থন পেতে পারেন। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর ইশতেহারের মূলে ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রাখা। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্যে বেতন কাঠামো নির্ধারণ, নদী-হাওর, জলসম্পদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। আসন্ন নির্বাচনে আল ইসলাহ প্রার্থীদের ইশতেহারপত্রে কী থাকবে এ বিষয়ে তাদের পথসভার বক্তব্য থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামী মূল্যবোধ বিরোধী বিতর্কিত সকল পাঠ বাতিল করা। এনসিটিবি থেকে পৃথক করে মাদ্রাসার জন্য স্বতন্ত্র কারিকুলাম বোর্ড গঠন। আবাসিক মাদ্রাসা ও এতিমখানায় মাথাপিছু ক্যাপিটেশন গ্রান্ট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, কলেজ পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করণ। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ নন-মেজর কোর্স চালু করণ, এতীম-বিধবা, গৃহহীন পঙ্গু ও নিসন্তান লোকদের পুনর্বাসন, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতন কাঠামো তৈরি, পরিবেশ ও বন্যা সংকট নিরসনে নদী খনন ও হাওর সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।
দ্বাদশ নির্বাচনে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর ইশতেহারের মূল বিষয় ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বেতন কাঠামো, নদী-হাওর ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন। আসন্ন নির্বাচনে এসব বিষয়ের পাশাপাশি আরও কিছু অগ্রাধিকার যুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে রয়েছে পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামী মূল্যবোধবিরোধী সব বিতর্কিত পাঠ বাতিল, এনসিটিবি থেকে পৃথক করে মাদ্রাসার জন্য স্বতন্ত্র কারিকুলাম বোর্ড গঠন, আবাসিক মাদ্রাসা ও এতিমখানায় মাথাপিছু ক্যাপিটেশন গ্রান্ট, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, কলেজ পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ নন-মেজর কোর্স চালু।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ফুলতলী দরবারের পক্ষ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। এসব দাবির মধ্যে মাদ্রাসার জন্য স্বতন্ত্র কারিকুলাম বোর্ড, ইবতেদায়ী মাদ্রাসা মঞ্জুরি ও এমপিওভুক্তকরণ, পৃথক মহিলা মাদ্রাসা স্থাপন, মিড-ডে মিল ও উপবৃত্তি এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরি জাতীয়করণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। আসন্ন নির্বাচনে সমর্থন প্রদানের ক্ষেত্রে এসব দাবি বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজ মূলত দুটি বড় ধারায় বিভক্ত ; একটি ফুলতলী, অন্যটি কওমী। কওমী বা দেওবন্দী ঘরানা রাজনৈতিকভাবে নানা দলে বিভক্ত হলেও, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তথা সুন্নি মুসলমানদের বড় অংশ ফুলতলী পীর ছাহেবের মুরীদিন ও মুহিব্বিন। তাঁদের অনেকে সরাসরি আল ইসলাহর রাজনীতিতে যুক্ত, আবার কেউ কেউ বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয়।
এই বাস্তবতায় সিলেটের রাজনীতিতে ফুলতলী মসলকের ভোটব্যাংক একটি শক্তিশালী ও নির্ধারক ভূমিকা রাখে। সে কারণেই প্রায় সব দলের প্রার্থীর দৃষ্টি এখন ফুলতলীর দিকেই। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে আসন্ন ফুলতলীর ঈসালে সাওয়াব মাহফিল থেকেই।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।