ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা পাইলটের মতো কাঙ্ক্ষিত পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে হলে শহরে থাকতে হবে, নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে, কোচিং করতে হবে, বাসায় গৃহশিক্ষক রাখতে হবে, থাকতে হবে অর্থবিত্ত ও উন্নত পারিবারিক পরিবেশ। সমাজে প্রচলিত এমন ধারণাকেই যেন পাল্টে দিয়েছেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মেধাবী তরুণ গোলজার হোসেন।
বিদ্যুৎবিহীন গ্রাম, কাঁচা-মেঠো পথ, সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন নিজের স্বপ্নের ঠিকানা। ৪৮তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি গেজেটে সহকারী সার্জন হিসেবে নিয়োগের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন তিনি।
গোলজার হোসেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল ইউনিয়নের ফুলতৈলছগাম গ্রামের মো. রিয়াজ উদ্দিন ও রাহিমা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে প্রথম। তার বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসার পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজে যুক্ত এবং মা গৃহিণী। প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা গোলজারের শৈশব কেটেছে অন্য দশজন গ্রামের শিশুর মতোই। বাবাকে কৃষিকাজ ও দোকানের কাজে সহযোগিতা করা, মাছ ধরা, মাঠে খেলাধুলা এবং পড়াশোনা নিয়েই ছিল তার বেড়ে ওঠা।
বিদ্যুৎ ও ভালো যোগাযোগব্যবস্থার অভাব, গ্রামের কাদামাখা মেঠোপথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া এবং কোনো ধরনের প্রাইভেট টিউশন ছাড়াই পড়াশোনা করেছেন তিনি। কিন্ডারগার্টেনের সুযোগ না থাকলেও গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত নিজের মেধা ও পরিশ্রমে এগিয়ে যান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি গোলজার। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে আরও এক বছর কঠোর পরিশ্রম করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। ২০১৮ সালে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়ে ২০২৫ সালে সফলতার সঙ্গে কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর ৪৮তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী সার্জন হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পান।
গত ২৫ আগস্ট প্রকাশিত সরকারি গেজেটে ৪৮তম বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৪৮১১২৫৫৬ নম্বরে তার নাম তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে গ্রামের সেই মেঠোপথ পেরিয়ে বেড়ে ওঠা গোলজার হোসেন এখন পরিচিত হয়েছেন ‘ডা. গোলজার হোসেন’ হিসেবে।
শুধু গোলজারই নন, তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার দ্বিতীয় ভাই হাফিজ মো. আখতারুল ইসলাম ২০২০ সালে আরটিভি-পিএইচপি কোরআনের আলো প্রতিযোগিতায় সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন গোলজার। তিনি পাবলিক ইউনিভার্সিটিজ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব গোয়াইনঘাটের সভাপতি, ডামেক মেডিসিন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং ফুলতৈলছগাম শিক্ষা উন্নয়ন পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের সফলতার অনুভূতি জানতে চাইলে ডা. গোলজার হোসেন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই সবসময় পড়াশোনা করতে ভালোবাসতাম। স্বাভাবিকভাবে পরিবারের মানুষজন পড়াশোনা করতে উৎসাহিত করেন, যাতে যেকোনো ছাত্র পড়াশোনায় মনোযোগী হয়। আমার ক্ষেত্রে হতো উল্টো। আমি এত বেশি পড়াশোনা করতাম যে, পরিবারের মানুষজন আমাকে বেশি পড়তে বারণ করতেন।”
তিনি বলেন, “আমার এই সাফল্যের পেছনে বাবা, মা ও আমার স্ত্রী তাহমিনা বেগমের অবদান অনেক। তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। এর পাশাপাশি আমার শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছেও কৃতজ্ঞ। সবার কাছে দোয়া চাই, যেন আমি আমার মহান পেশার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি।”
স্কুলজীবনে ‘এইম ইন লাইফ’ রচনায় ডাক্তার হয়ে বিনামূল্যে গ্রামের মানুষের সেবা করার কথা লিখলেও বাস্তব জীবনে অনেকেই তা ভুলে যান। এ প্রসঙ্গে ডা. গোলজার হোসেন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার এইম ইন লাইফ ছিল ডাক্তার হওয়া। মহান আল্লাহ তা পূরণ করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। আমি মানুষকে সঠিক ও মানসম্মত চিকিৎসা দিতে চাই। পাশাপাশি গরিব ও অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়াতে চাই নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে।”
পেশাগত জীবনে নিজ জেলা সিলেটে থেকে মানুষের সেবা করতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, “পেশাগত জীবনে সিলেটে স্থায়ী হতে চাই। তবে প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য রাজধানী ঢাকা, এমনকি বিদেশেও যেতে চাই।”
গোলজার হোসেন নিজ গ্রামের ফুলতৈলছগাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি, এলাকার সোনার বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি ও ২০১৫ সালে এসএসসি এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
সন্তানের এ সাফল্যে গর্বিত বাবা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “স্কুলে থাকতেই গোলজার পড়ালেখার পাশাপাশি আমাকে গৃহস্থালি ও সংসারের নানা কাজে সহযোগিতা করেছে, এখনো করে। তাকে অতিরিক্ত শিক্ষক রেখে পড়াতে হয়নি। আল্লাহর রহমতে তার মেধা ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আমার ছেলে আজ ডাক্তার। বাবা হিসেবে আমি খুবই আনন্দিত। আমার ছেলের জন্য দোয়া ও ভালোবাসা দেওয়ায় তার সকল শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, গ্রাম ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সবশেষে আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।”
গোলজার হোসেনের এ সাফল্যে তার নিজ গ্রাম ফুলতৈলছগামসহ গোয়াইনঘাট উপজেলাবাসীর মধ্যে আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং কর্মজীবনে সফলতার জন্য দোয়া করেছেন এলাকাবাসী।
প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া গোলজার হোসেন যেন প্রমাণ করলেন, সাফল্যের জন্য সবসময় বড় শহর, বিত্ত কিংবা বিশেষ সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন হয় না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও লক্ষ্য স্থির থাকলে গ্রামের মাটিতেও ফুটতে পারে সাফল্যের গন্ধরাজ ফুল।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।