
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের চার জেলাতেই বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। হবিগঞ্জের খোয়াই এবং মৌলভীবাজারের মনু নদীর একাধিক পয়েন্টে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে তীব্র বেগে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে দুই জেলার অন্তত ৭৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ ও সিলেটে নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
হবিগঞ্জ থেকে পাঠানো তথ্যে জানা গেছে, ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে খোয়াই নদী। বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর বাঁধ ভেঙে পানি হাওরে ঢুকে পড়ে। চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় তীব্র নদীভাঙনে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবারসহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়েছে। ঝুঁকিতে থাকা মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধ এলাকাবাসী বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার গাফিলতিতেই এই ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এবং প্লাবিত এলাকার বহু ঘরে কোমরসমান পানি ওঠায় মানুষ গবাদিপশু ও আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থান, আত্মীয়ের বাড়ি এবং আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল হক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জানান, পরিস্থিতি তদারকিতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। জরুরি মোকাবিলায় ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও ১৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে এবং দুর্গতদের জন্য ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬ টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ওইদিন বিকেল ৫টার দিকে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হরিপাশা, উজিরপুর, কান্দিরকুলসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। ভাঙ্গারহাট এলাকায় মনু নদীর পানি বাঁধের সমতলে পৌঁছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এছাড়া মনু নদীর রাজনগরে দুটি ও কুলাউড়ার একটি পয়েন্টে এবং ধলাই নদীর মখাবিল এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, মখাবিল এলাকাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায়ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধার কারণে সেখানে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ করা সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গলের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হাইল হাওরের পানি আংশিকভাবে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর-ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কের নূরজাহান চা বাগানের গোয়াবাড়ি এলাকায় একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে এবং আদমপুর-ইসলামপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
সিলেট জেলা ও আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে গত ৭২ ঘণ্টায় এ বছরের রেকর্ড ১৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। জেলার ১১টি নদীর পয়েন্টেই পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। সুরমা নদীর পানি কিনব্রিজ ও চাঁদনিঘাট এলাকায় এখনো বিপদসীমার নিচে থাকলেও তা ক্রমাগত বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে টানা বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের সুরমা, যাদুকাটা, বৌলাই, রক্তি ও পাটলাই নদীর পানি ক্রমেই বাড়ছে।শুক্রবার সকালে সুরমা নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী-২ এমদাদুল হক জানান, চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি কমলে নদীর পানি কমতে শুরু করবে, তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মেহেদী হাসান হৃদয় বলেন, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিকেল টিম গঠন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও নৌযান প্রস্তুত রাখাসহ কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।