
ভারতের মেঘালয় থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে সিলেটের প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও তীব্র হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকার বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা জারি করেছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ ও বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলার প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে। পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিতে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন দেখা দিলেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রশাসন।
গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে সীমান্ত বেয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি সিলেটের নদ-নদীতে প্রবেশ করে পানির উচ্চতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাবে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় সাময়িক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
পাউবোর তথ্যমতে, বর্তমানে অধিকাংশ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও অমলশিদ ও কানাইঘাটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, উজানের পানি দ্রুত মেঘনা অববাহিকা হয়ে নেমে যাওয়ায় এই সম্ভাব্য বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং আগামী দুই-তিন দিনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন,‘আগামী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগজুড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।’
এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার জানান, সরকারি হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ টিলার সংখ্যা ১৬০টি উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩৮৬টি পরিবার চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এসব টিলায় বসবাস করছে।
তিনি বলেন,‘২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে টিলা ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু অতিবৃষ্টি নয়, নির্বিচারে টিলা কাটার কারণেই ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং টিলা কাটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন,‘আগামী তিন থেকে চার দিন মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ি ঢল নেমে কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে উজানের পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
বন্যা মোকাবিলায় নগর কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি সম্পর্কে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন,‘সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি কর্পোরেশন প্রস্তুত রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। নিচু এলাকায় পানি উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।’
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন,জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক করতে মাইকিং চলছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান,‘জেলায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’
মন্তব্য করুন
সম্পাদক ও প্রকাশক : জুবায়ের আহমদ
সম্পাদক কর্তৃক নিউ বর্নমালা অফসেড প্রেস, রাজা ম্যানশন,জিন্দাবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
রেজি নং : চ-৭০০, ডিক্লারেশন নং: সিল-১৪৩/১৪।