টাকার অভাবে নবজাতক সন্তানের চিকিৎসার বিল দিতে পারছিলেন না বাবা। একপর্যায়ে শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। এ ঘটনায় বিপাকে পড়েন সদ্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া মা। এমন পরিস্থিতিতে নবজাতক ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জের মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ডা. ইরশাদ আলী হাসপাতাল। হাসপাতালটির উদ্যোগে নিজেদের চিকিৎসা ব্যয় মওকুফের পাশাপাশি সিলেটের একটি ক্লিনিকের বিল কমানোর ব্যবস্থা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত নবজাতককে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে পরিবারটি।
ঘটনাটি গত ২৩ অক্টোবরের। জকিগঞ্জ উপজেলার কসকনপুর ইউনিয়নের বিয়াবাইল গ্রামের কবির আহমদের মেয়ে মারজানা আক্তার কলির অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম হয় ডা. ইরশাদ আলী হাসপাতালে। জন্মের পর নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত তাকে পরিষ্কার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, শিশুটিকে সিলেটে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার বাবার কিছুটা অনীহা দেখা দিলে তারা নিজেরাই অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। শিশুটির বাবা রাবেল আহমদ ও নানি আমেনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে নবজাতককে সিলেটের মা ও শিশু ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়।
তবে বিপত্তি দেখা দেয় হাসপাতালের বিল পরিশোধের সময়। গত ২৬ অক্টোবর রাতে চিকিৎসার বিল বাবদ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে অপারগতা জানান রাবেল আহমদ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ সময় তিনি প্রয়োজনে নবজাতককে বিক্রি করে দেওয়ার কথাও বলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে শিশুটির পরিবারকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন ডা. ইরশাদ আলী হাসপাতালের পরিচালক কামিল আহমদ ও তাঁর চাচাতো ভাই মাজহারুল ইসলাম সেলিম।
তাঁরা ডা. ইরশাদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ মওকুফ করেন। পাশাপাশি সিলেটের মা ও শিশু ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিল কমানোর অনুরোধ জানান। এতে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষও বিলের কিছু অংশ মওকুফ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্নজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এসব উদ্যোগের ফলে নবজাতককে নিয়ে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা হয়।
নবজাতকের বাবা রাবেল আহমদ সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের দক্ষিণ দুবাগ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। আর শিশুটির মা মারজানা আক্তার কলির বাবার বাড়ি জকিগঞ্জের কসকনপুর ইউনিয়নের বিয়াবাইল গ্রামে।
জকিগঞ্জের মানিকপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের সন্তান ডা. ইরশাদ আলী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এর আগে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে তিনি নিজ বাড়িতে দাতব্য হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন।
হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০৪টি প্রসবসেবা দিয়েছে। এর মধ্যে ৯৮টি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ঘটনা রয়েছে। চারজন মিডওয়াইফ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে হাসপাতালটিতে প্রসূতিসেবা দেওয়া হয়।
ডা. ইরশাদ আলীর ভাতিজা কামিল আহমদ ও মাজহারুল ইসলাম সেলিম বর্তমানে হাসপাতালটির কার্যক্রম দেখাশোনা করছেন। কামিল আহমদ সিলেটের আরটিএম হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছেন। মাজহারুল ইসলাম সেলিমের স্ত্রী রুবেনা বেগমও দীর্ঘদিন কালিগঞ্জের সূর্যের হাসি ক্লিনিকে প্রসূতিসেবায় যুক্ত ছিলেন।
আর্থিক সংকটে চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এ উদ্যোগ এলাকায় প্রশংসা পেয়েছে। তবে ঘটনাটি একই সঙ্গে নবজাতকের চিকিৎসা এবং প্রসূতি মায়ের সুস্থতার মতো জরুরি বিষয়ে আর্থিক সংকটে পড়া পরিবারগুলোর অসহায়ত্বের চিত্রও সামনে এনেছে।



