বড় ব্যবধানে জিততে পারেন মাও.হুছামুদ্দীন চৌধুরী

পুরো সিলেটের নজর জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের দিকে
নৌকা বা ট্রাক নয়, মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরীর কেটলির প্রতি জনমানুষের নজিরবিহীন সাড়া
জুবায়ের আহমদ, জকিগঞ্জ (সিলেট) থেকে,
বৃহত্তর সিলেটের ১৯ টি আসনের মধ্যে সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনটি বরাবরই ইসলামপ্রিয় জনতার পুণ্যভূমি। সেই পাকিস্তান আমল থেকে ভোটের মাঠে  এই আসনে আলেম উলামা, পীর-মাশায়েখদের পদচারণার ইতিহাস বেশ গৌরবের। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন খলিফায়ে বদরপুরী, শায়খুল হাদীস আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) । সে সময় এই আসন সিলেট সদর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন শায়খুল হাদীস মাওলানা উবায়দুল হক উজিরপুরী (রহ.)। ২০০১ সালেন নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদউদ্দীন চৌধুরী। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রায় সব কটি জাতীয় নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর নেতারা হয় সংসদ সদস্য নতুবা দ্বিতীয় হয়েছেন। এবারও ভোটের মাঠে একই চিত্র। এ আসনের ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র আলেম মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর পালে দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্থরের মানুষের বাধভাঙ্গা জোয়ার লক্ষ করা যাচ্ছে। সকল ভেদাভেদ ভূলে জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের সর্বস্থরের আলেম উলামা ও ধর্মপ্রান মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। বুহত্তর সিলেট অঞ্চলে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ)-এর অনুসারীদের ভোটের পরিসংখ্যান ব্যাপক। প্রতিটি নির্বচনে আল্লামা ফুলতলী প্রতিষ্ঠিত আনজুমানে আল-ইসলাহকে ভোটের মাঠে বিগ ফ্যাক্টর হিসেবে ধরা হয়। অধিকাংশ উপজেলায় এক চেটিয়া আধিপত্য রয়েছে ফুলতলী অনুসারীদের। এ কারণে আল ইসলাহর ভোট টানতে আওয়ামী লীগের নজর মাও. হুছামুদ্দীনের দিকে ছিল সবসময়। এবারো সিলেট অঞ্চলের ১৯টি আসনে আল ইসলাহ, তালামীয ও ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর অনুসারীরা যে প্রার্থীর পক্ষে থাকবেন তাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ইতোমধ্যে জকিগঞ্জ-কানাইঘাট এই দুই উপজেলার কওমী-আলিয়াসহ সকল ঘরানার আলেম উলামাদের সমর্থন ও ভালোবাসা তাঁকে ঘিরে লক্ষ্য করা গেছে। কওমী অঙ্গনের উজ্জল নক্ষত্র শায়খুল হাদীস আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) ছিলেন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর পীর ভাই। তাঁদের উভয় পরিবারের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। বায়মপুরী (রহ.)-এর বিশাল প্রভাব রয়েছে কানাইঘাট এলাকায়। সেই সুবাধে কানাইঘাটে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। তাছাড়া এই জনপদের মানুষের সুখে দুঃখে, এতিম-অনাথ, দুঃস্থ্য বিধবা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যানে সারাবছর কাজ করে থাকে ফুলতলী ছাহেব বাড়ী। সাধারণ মানুষ এই পরিবারের কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত রাখে। 

তাছাড়া জকিগঞ্জের আরেক প্রখ্যাত বুযুর্গ রায়পুরী ছাহববাড়ীর লোকজনও প্রকাশ্যে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর পক্ষে প্রচার প্রচারনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন। রায়পুরী পীর ছাহেব (রহ)-এর নাতি মাওলানা ডা. হাবীবুল্লাহ মিসবাহ রায়পুরী ছাহেব বাড়ীতে অনুষ্ঠিত কেটলি মার্কার উঠান বৈঠকে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীকে সমর্থন জানিয়েও বক্তব্য রেখেছেন। যা একটি বিরল ঘটনা, কারন রায়পুরী ছাহেব বাড়ীতে ইতিপূর্বে কোনো নির্বাচনী বৈঠক হয়নি। মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর প্রতি ভালবাসার কারনে এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাও. হাবীবুল্লাহ মিসবাহ।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী বীরমুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, স্বতন্ত্রপ্রার্থী আহমদ আল কবিরের ছায়াতল থেকে একে একে সরে যাচ্ছেন নেতারা। তারা সবাই অবস্থান নিচ্ছেন উপ- মহামহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ শামসুল উলামা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর ছোটো ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে। জকিগঞ্জ কানাইঘাটের বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানও মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে কেটলি প্রতিকের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। এরমধ্যে কাজলসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আশরাফুল আম্বিয়া মাও. হুছামুদ্দীনের পক্ষে নির্বাচনী বিভিন্ন সভায় বক্তব্য দিয়ে ভোট চাচ্ছেন। কানাইঘাটের লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জমিয়ত নেতা মাওলানা জামাল উদ্দিনসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ইতিমধ্যে মাওলানা হুছামুদ্দীনের পক্ষে প্রকাশ্যে এসেছেন। তারা ভোটও চাইছেন। 

২০০৬ সালের নির্বাচনে মহাজোট থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। যদিও ১/১১ পট-পরিবর্তনের কারনে সেই নির্বাচন আর হয়নি। পরবর্তিতে প্রতিটি নির্বাচনে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী প্রার্থী হচ্ছেন এমন গুঞ্জন থাকলেও তিনি প্রার্থী হননি। বিগত দিনেও নৌকা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার জন্য হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীকে প্রস্তাব দেয়া দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আসেন নি। এবার নির্বাচনে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরী নিজ দলীয় নেতাকর্মী ও আলেম উলামাদের অনুরোধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় এলাকায় তাঁকে ঘিরে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীসহ অন্য প্রার্থীরা অনেকটা বেকায়দায় পড়েছেন। এর মধ্যে গত ৫ ডিসেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরীর সাক্ষাৎ আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। বৈঠকের পর থেকে মাও. হুছামুদ্দীন চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকায় তাঁর অনুসারীরা বিষয়টিকে ‘শুভ ইঙ্গিত’ বলে প্রচার শুরু করেন।

আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা বলছেন, স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ এখন তিনটি ধারায় বিভক্ত। এর মধ্যে মাসুক উদ্দিন ও আহমদ আল কবিরের পক্ষে দুটি পক্ষ সক্রিয়। আরেকটি বৃহৎ অংশ সক্রিয় আছে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর কেটলি মার্কাকে নিয়ে। ওই পক্ষ নৌকাকে পাশ কাটিয়ে হুছামুদ্দীন চৌধুরীকে জয়ী করতে চেষ্টা করছে। এমনকি তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা মাও. হুছামুদ্দীনের প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগেও অংশ নিচ্ছেন।
মাও. হুছামুদ্দীনকে সমর্থন দিয়ে জকিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগ ও কানাইঘাট উপজেলা ছাত্রলীগ কেটলি প্রতীকের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে । নৌকা প্রতীকের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও আওয়ামীলীগের ওই পক্ষ মাও. হুছামুদ্দীনের পক্ষে কাজ করছে।  জকিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুলতান আহমদ জানিয়েছেন- আমরা নির্দেশনা মতো কাজ করছি। মাওলানা হুছামুদ্দীনকে জয়ী করতে ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছে কর্মীরা।

যোগাযোগ করলে আওয়ামীলীগের  প্রার্থী মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এলাকার সব মানুষ আমার পক্ষে। আওয়ামী লীগও ঐক্যবদ্ধ। তবে তলেতলে দলের কিছু নেতা-কর্মী হুছামুদ্দীনের পক্ষে আছে। ওই ব্যক্তিরাই আওয়ামী লীগকে শেষ করে দিচ্ছে। তবে কাজ হবে না, নৌকার বিজয় হবেই।’

মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- আমি নির্বাচনে এসেছি আগামীর জন্য। আমি নিজের ইচ্ছায় নির্বাচনে আসিনি। এদেশের প্রথিতযশা আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ ও আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.)-এর মুহিব্বীনদের চাপে নির্বাচনের নেমেছেন বলে জানিয়েছেন। আলেম-উলামা এবারের নির্বাচনে তার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবেই মাঠে থাকবেন। এক্ষেত্রে তিনি আগামী নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। যেদিকেই যাচ্ছেন সাড়াও পাচ্ছেন। তিনি জানান- নির্বাচিত হলে মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষাসহ পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামবিরোধী বিষয়াদি দুরীকরণে সাহসী ভূমিকা পালন করবো। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে অনেক স্নেহ করে থাকেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকেছিলেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনেক বিষয়ে কথা বলেছি। আমি স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আসায় তিনি আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই আমাকে সংসদে দেখার আহ্বান করেছিলেন। নির্বাচনে যেসব দল অংশগ্রহণ করেনি তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন-  স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় আলেম-উলামা অধ্যুষিত এ জনপদের সর্বস্তরের মানুষ দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হবো।
-
জুবায়ের আহমদ 
জকিগঞ্জ (সিলেট) উপজেলা সংবাদদাতা 
মোবা : ০১৭১১-২২৪৫৯৮
নবীনতর পূর্বতন